কক্সবাজার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল

কক্সবাজার বাস টার্মিনাল

ভ্রমণের শুরুটাই যদি হয় বিভ্রান্তি আর বিশৃঙ্খলায় ভরা, তাহলে সামনের দিনগুলো কেমন যাবে, আপনি বুঝতেই পারছেন। কক্সবাজারে যারা বাসে করে আসেন, তাদের জন্য সেই শুরুর পয়েন্ট—কক্সবাজার কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনাল। আপনি এখানে নামবেন, চারপাশে ভিড়, ডাকে হোটেল-দালাল, দরাদরি, হইচই—এ সবই চেনা চিত্র। কিন্তু একটুখানি হোমওয়ার্ক আপনাকে বাঁচাতে পারে অনাকাঙ্ক্ষিত যন্ত্রণা থেকে।

এই লেখায় আমরা শুধু বলবো না “টার্মিনাল কোথায়”, বরং এটা কেমন, কীভাবে চলবেন, কোন ফাঁদ এড়িয়ে যাবেন, কোথায় খাবেন, কত খরচ পড়বে, আর কীভাবে আপনি শহরে ঢোকার সময়ই বাকি ভ্রমণটাকে সহজ করে তুলতে পারেন—সবটা তুলে ধরা হলো একেবারে আপনার মতো ট্রাভেলারদের জন্য।

কোথায় আছে এই বাস টার্মিনাল?

টার্মিনালটির ভৌগোলিক লোকেশন ঠিক শহরের সেন্টারেই।

অবস্থান: লারপাড়া, কক্সবাজার শহর/পৌরসভা
গুগল ম্যাপস লিংক: Google Maps লিংক

এখান থেকেই শহরের সব গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় যাওয়া যায়:

পাবলিক ট্রান্সপোর্ট:
রিকশা, সিএনজি, ব্যাটারিচালিত টমটম—টার্মিনাল গেটের সামনেই লাইনে দাঁড়িয়ে থাকে। দরদাম আগে থেকেই জেনে নিতে হয়।

টার্মিনালের স্ট্রাকচার ও ভিতরের চিত্র

  • মোট বাস কাউন্টার: প্রায় ৩০টির বেশি, শহরের সব বড় কোম্পানির টিকিট এখানেই পাওয়া যায়
  • বাস সার্ভিস টাইপ: নন-এসি, এসি, ভিআইপি এসি, স্লিপার কোচ
  • বিশ্রামাগার: বেসিক মানের, অত সুবিধা নেই
  • মসজিদ ও নামাজঘর: একটি ছোট মসজিদ রয়েছে পাশেই
  • খাবার দোকান: বিস্কুট, পানি, কেক, মুড়ি থেকে শুরু করে হালকা নাস্তার দোকান আছে
  • শৌচাগার: আছে, তবে নিয়মিত পরিষ্কার হয় না—বিশেষত রাতে অবস্থা ভালো থাকে না বা পর্যটকদের মান অনুযায়ী না
  • সিকিউরিটি: আনসার বাহিনী মোতায়েন থাকে, তবে অনেক সময় অনুপস্থিত বা কিন্তু ২৪ ঘণ্টা চোখ রাখে না

এখানে একটাই জিনিস আপনার কাজে লাগবে—স্মার্ট থাকা। কাউকে বিশ্বাস করার আগে নিশ্চিত হন আপনি কোথায় যাচ্ছেন, কত খরচ করবেন।

কী দেখতে পাবেন নামামাত্র?

প্রথম ৫ মিনিটে যা আপনার চোখে পড়বে:

  • বাস থেকে নামার সাথে সাথে হেল্পাররা টানাটানি করে বলবে “ভাই হোটেল?” “ভাই রুম লাগবে?”
    • তাদের এড়িয়ে চলুন, ভদ্রভাবে “না” বলুন।
  • স্থানীয় সিএনজি/রিকশাচালক আপনাকে বলবে, “সী বিচ ১০ মিনিট ভাই, ২০০ টাকা”—মিথ্যা।
    • স্বাভাবিক ভাড়া ৬০–৮০ টাকা। দরদাম করে নিন।
  • রাস্তার পাশেই গড়ে ওঠা ‘অননুমোদিত’ বাস কাউন্টার ও দোকান
    • এগুলো থেকে বুকিং না করাই ভালো। ফাঁকি বা দালালির সম্ভাবনা বেশি।
  • চারপাশে আছে খাবারের দোকান, কাউন্টার, মোবাইল চার্জার স্টেশন, এমনকি একদুটো ফার্মেসিও।
    • নরমালি এসব দোকান নিরাপদ, কিন্তু দাম একটু বেশিই চায়।

যেখানে যাবেন টার্মিনাল থেকে

গন্তব্যগাড়ি / সময়মোটামুটি ভাড়া
লাবণী পয়েন্টটমটম, ৮–১০ মিনিট৳৬০–৮০
কলাতলী সী বিচটমটম/ রিকশা, ৫–৬ মিনিট৳৫০
সুগন্ধা পয়েন্টটমটম, ১২–১৫ মিনিট৳৮০–১০০
হিমছড়িরিজার্ভ সিএনজি, ২৫ মিনিট৳২৫০–৩০০
ইনানী/টেকনাফলোকাল বাস / মাইক্রো৳৩০০–৫০০

কোন বাসে আসবেন/যাবেন?

বাস সার্ভিসঢাকা → কক্সবাজারকাউন্টার নম্বর
Ena Transport৳১০০০–১২০০ (ফ্যামিলি ফ্রেন্ডলি সার্ভিস)০১৩১৩-০৫৬৭৮৯
Shyamoli NR Travels৳৯০০–২৭০০ (AC/Non-AC, ভিআইপি কোচ)০১৭১১-৩০৪৬৬৬
Green Line৳২০০০–৩০০০ (স্লিপার কোচ, দ্রুতগামী)০১৯৭০-০৬০০৮০
Star Line৳৮৫০–১৫০০ (অন-টাইম ট্রিপ, মধ্যবিত্তদের জন্য পারফেক্ট)০১৯৭৩২৫৯৬৭৩

চট্টগ্রাম থেকে আসছেন?
সময় লাগে ৩.৫ ঘণ্টা, ভাড়া মাত্র ৩০০–৮০০ টাকা।

টিকিট বুকিং?

ট্রাভেলারদের জন্য ১১ টি ইনসাইড টিপস

  1. ভোরে বা দুপুরে বাসে নামুন—ভিড় কম থাকে, হোটেল খুঁজতে সুবিধা হয়।
  2. সরাসরি সী বিচ না গিয়ে প্রথমে হোটেলে উঠুন।
    মালপত্র নিয়ে ঘুরে বেড়ানো মানেই ঝুঁকি।
  3. থাকা র ব্যবস্থা: বাজেট হোটেল যেমন Hotel Cox Today Budget Room, Laboni Guest House সহজেই পাওয়া যায়। খাবারের জন্য “Kacchi Bhai Express” বা “Poushi Restaurant” সেরা অপশন।
  4. লোকাল রেস্টুরেন্টে খেতে পারেন, যেমন “Hotel Sayeman Canteen”, “Kacchi Bhai Express” বা “Poushi Restaurant”—রুচিশীল, অথচ সাশ্রয়ী।
  5. বিচের কাছাকাছি নামতে চাইলে বাসে উঠার সময়ই বলে দিন, “কলাতলী নামবো”।
  6. সন্ধ্যার পর টার্মিনাল এলাকা ফাঁকা হয়ে যায়। রাতে ট্রিপ থাকলে আগে থেকে ট্রান্সপোর্ট ঠিক করে রাখুন।
  7. রাত ৯টার পর: অধিকাংশ কাউন্টার বন্ধ হয়ে যায়। তাই আগে থেকেই হোটেল বুক করে রাখুন বা কাছাকাছি নামুন।
  8. কাউন্টার ছাড়া টিকিট নেবেন না। দালালরা অনেক সময় নকল টিকিট দেয়।
  9. যদি ফ্যামিলি নিয়ে আসেন, কলাতলী মোড়েই নেমে হোটেলে যান—টার্মিনালটা খুব ফ্যামিলি-ফ্রেন্ডলি নয়।
  10. বিজি সিজনে (ডিসেম্বর–জানুয়ারী):
    টার্মিনালের আশেপাশে জ্যাম লেগে যায়। বাসগুলো কলাতলী বা ডলফিন মোড়েই নামিয়ে দেয়।
  11. সতর্কতা:
    দালালদের ফাঁদে পা দেবেন না—“ভালো হোটেল ভাই, ডিসকাউন্টে দিচ্ছি”—এই কথায় হোটেল নিয়ে গেলে তারা কমিশন নেয়, আপনাকে চড়া রেট দিতে হয়।

কক্সবাজার বাস টার্মিনাল এমন এক জায়গা যা আপনাকে শহরের মুখোমুখি করায়। আপনি এখন জানেন—কোথায় নামবেন, কীভাবে যাবেন, কাকে বিশ্বাস করবেন। পরিকল্পনামাফিক ভ্রমণ মানেই ঝামেলামুক্ত অভিজ্ঞতা।